শিশুর জ্বর হলে করণীয়

শিশুদের প্রায়ই জ্বর হয়। চিকিৎসকের কাছে যেসব শিশু আসে তার ৩০ ভাগ শিশুকে আনা হয় জ্বর  নিয়ে। তাই সবারই জেনে রাখা উচিত শিশুর জ্বর হলে করণীয় কি? শিশুর জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায়। বাচ্চাদের জ্বর হলে করনীয় কি? বা শিশুর জ্বর হলে করনীয়।

শিশু বয়সের জ্বর উপসর্গকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, শিশুর বয়স অনুযায়ী। খুব ছোট্ট শিশু মানে এক বছরের কম বয়সী শিশু, ৩ থেকে ৩৬ মাস বয়সী শিশুর জ্বর এবং তিন বছরের বেশি বয়সী শিশুর জ্বরের ধরন ধারণে আছে ভিন্নতা।

আরো পড়ুনঃ শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করুন ঘরোয়া উপায়ে

খুব ছোট্ট শিশুর জ্বর হলে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা, এদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম, তা ছাড়া তাকে টিকাদান সুরক্ষা ব্যবস্থাও দেওয়া হয়ে ওঠেনি। অন্যান্য অসুস্থতার লক্ষণও তেমন বোঝা যায় না। এ বয়সে জ্বরের জন্য জিবিএম, ই.কোলাই, এইচ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মারাত্মক রোগজীবাণু দায়ী হতে পারে।
৩-৩৬ মাস বয়সী শিশুরা সাধারণত স্ট্রেপটো নিউমোনিয়া, নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস, সালমোনেলা, স্টেফাইলো ইত্যাদি জীবাণুর মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে।

শিশুদের জ্বর যেসব রোগের কারণে হয়

শ্বাসতন্ত্রের অসুখ: ঠান্ডা-সর্দি, কান পাকা, সাইনোসাইটিস
ফুসফুস: ব্রনকিওলাইটিস, নিউমোনিয়া
মুখগহ্বর: টনসিলাইটিস, দাঁতের ফোড়া
স্নায়ুতন্ত্র: মেনিনজাইটিস
অন্যান্য: আন্ত্রিক অসুখ, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ, গিঁটের সংক্রমণ, রক্তে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি, টিকাদান-পরবর্তী জ্বর, ভাইরাসজনিত অসুখ—চিকেন পক্স, হাম, ক্যানসার ইত্যাদি।
জ্বর হলে যা জানা জরুরি
-শিশুর জ্বর কত দিন ধরে, কত মাত্রায়-তা খেয়াল রাখুন ও চিকিৎসককে অবহিত করুন।
-জ্বরের সঙ্গে র্যাশ, বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, প্রস্রাবে সমস্যা, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট আছে কি না, তাও জানান।
-বাড়িতে বা আপনজনদের মধ্যে অন্য কেউ অসুস্থ কি না, সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
-এ পর্যন্ত শিশুর কী কী টিকা সম্পন্ন হয়েছে এবং বাড়িতে কী কী ওষুধ সেবন করানো হয়েছে তা জানাতে ভুলবেন না।
-ঘরে পোষা প্রাণী আছে কি না, নিকট অতীতে কোথায় শিশুকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া হয়েছে (যেমন পাহাড়ি এলাকায়) এসব তথ্যও জানা দরকার।
-শিশু ছোটবেলা থেকেই কোনো অসুখে আক্রান্ত কি না, যেমন: হাঁপানি, অ্যালার্জি, জন্মগত হৃদ্রোগ তা অবশ্যই জানাবেন।

শিশুর জ্বর নিয়ে ভয় নেই

জ্বরের ব্যবস্থাপনা মূলত: দুই ধরনের। প্রথমত: জ্বর নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বিতীয়ত জ্বরের কারণ নির্ণয় করে কার্যকর চিকিৎসা। সাধারণভাবে জ্বর ক্ষতিকর কিছু নয় বরং এটি সংক্রমণ বা প্রদাহের বিরুদ্ধে শরীরের প্রথম প্রতিরোধ।
জ্বর নিয়ন্ত্রণে অ্যাসিটোমিনোফেন (প্যারাসিটামল) বা আইবুফ্রোপেন কার্যকর। শিশু বয়সে জ্বর নিবারণে কখনো অ্যাসপিরিন ব্যবহার করতে নেই। স্পঞ্জিং বা বার্থিং (উষ্ণ জলে) উপশমে সাহায্য করে, তবে বরফ জল বা অ্যালকোহলে বাথ অপকারী। জ্বরের শিশুকে বেশি অসুস্থ মনে হলে, বিশেষত: ২৮ দিনের কম বয়সী জ্বরে ভোগা সব শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া ভালো।

আরো পড়ুনঃ শিশুর পেটে কৃমি হলে করনীয়

শিশুদের জ্বর একটা উপসর্গ, জ্বর নিজে কোনও রোগ নয়৷ জেনে রাখুন, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমন হলে ঘনঘন জ্বর হয়৷ জ্বর হচ্ছে একটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা শিশুকে সংক্রমণ এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে৷ তবে জ্বর যে কারণেই হোক শিশুর জ্বরের চিকিৎসা করা প্রয়োজন৷ পাশাপাশি প্রয়োজন শিশুর সঠিক যত্ন৷ আপনার শিশুর জ্বর কমিয়ে স্বস্তিকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নিচের ব্যবস্থা গুলো অনুসরন করুনঃ

তাপমাত্রা পরিমাপ

সঠিক সময়ে তাপমাত্রা মাপুন শরীরের তাপমাত্রা সারা দিন ওঠা-নামা করে৷ তাপমাত্রা সাধারণ ভাবে শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যার শুরুতে সবচেয়ে বেশি থাকে, আর সবচেয়ে কম থাকে সকাল বেলা৷ কিন্তু বিভিন্ন অসুখে জ্বরের ওঠা-নামা বিভিন্ন রকম৷ তাই জ্বরের এই ওঠা-নামা লক্ষ্য করে সঠিক সময়ে তাপমাত্রা মাপা খুবই জরুরি৷ ব্যায়াম করলে এবং গরম খাবার খেলে তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে৷ তাই বাচ্চা গরম দুধ বা পানীয় পান করে থাকলে তার ৩০ মিনিট পর তাপমাত্রা পরিমাপ করবেন৷

ঠিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা মাপুন-শিশুর তাপমাত্রা সবচেয়ে ঠিক ভাবে পরিমাপ করা যায় পায়ু পথের থার্মোমিটারের (রেক্টাল থার্মোমিটার) সাহায্যে৷ এটা মুখের থার্মোমিটারের (ওরাল থার্মোমিটার) চেয়ে ছোট এবং এর বাল্ক বেশি পুরু৷ প্রথমে পেট্রোলিয়াম জেলি মেখে এটাকে পিচ্ছিল করে নেবেন, তারপর থার্মোমিটার টা ধীরে ধীরে পায়ু পথে ঢোকাবেন, লক্ষ রাখবেন দেড় ইঞ্চির বেশি যেন না ঢোকে৷ আর এটা আস্তে করে কমপক্ষে তিন মিনিট ধরে রাখবেন৷ এটা করার সময় শিশুকে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে অথবা আপনার কোলের মধ্যে নিয়ে ডায়াপার পাল্টানোর পজিশনে এটা করতে পারেন৷ সহজে যাতে ঢোকে সেজন্য শিশুর পা দুটো উঁচু করে ধরতে পারেন৷ অথবা, আপনি শিশুকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে তারপর থার্মোমিটার ঢোকাতে পারেন৷

বড় বাচ্চাদের মুখে অথবা বগলে মাপুন – যদি শিশুর বয়স চার বা পাঁচ বছর হয়, তাহলে মুখের থার্মোমিটারের (ওরাল থার্মোমিটার) সাহায্যে তার মুখের তাপমাত্রা মাপতে পারেন৷ এক্ষেত্রে বাচ্চার জিভের নিচে ওরাল থার্মোমিটার টি কমপক্ষে দুই মিনিট ধরে রাখতে হবে৷ ডিজিটাল থার্মোমিটার গুলোতে দ্রুত ও ঠিক ভাবে তাপমাত্রা মাপা যায় এবং এগুলো কাচ পারদ থার্মোমিটারের চেয়ে কিছুটা নিরাপদও৷ কিন্তু এগুলো খুব দামি৷ এছাড়া শিশুর তাপমাত্রা বগলের নিচেও মাপা যায়৷ এক্ষেত্রে বাচ্চার বগলের নিচে থার্মোমিটার টি কমপক্ষে দুই মিনিট ধরে রাখতে হবে৷

পরিমাপ যাচাই করুন- ঌ৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা কে সর্বোচ্চ স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরা হয়৷ যদি আপনার শিশুর তাপমাত্রা পায়ু পথে ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হয়, বগলে ঌঌ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হয়, অথবা মুখে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হয় তাহলে বুঝবেন আপনার শিশুর জ্বর হয়েছে৷

শিশুর জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায়

শিশুর যে কোন অসুখে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন৷ শিশুদের জ্বর হলে জ্বর কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খাওয়ান৷ 

শিশুর জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায় নিচে দেয়া হল। যেগুলি করে আপনি বাচ্চাদের জ্বর হলে জ্বর কমিয়ে সুস্থ করে তুলতে পারবেন।

স্পঞ্জ বাথ করান

শিশুকে স্বাভাবিক পানি দিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্পঞ্জ বাথ করাবেন৷ পানি শরীর থেকে বাষ্পী ভূত হয়ে যাবার সময় শরীর কে ঠাণ্ডা রাখে যার ফলে জ্বর কমে যায়৷ কখনও বেশি ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করবেন না কারণ এতে শিশুর কাপুনি ওঠে৷ কাপুনি প্রকৃত পক্ষে শরীরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে যার ফলে স্পঞ্জ বাথের পুরো উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে৷

শিশুকে প্রচুর পরিমাণ তরল খাওয়ান

জ্বর হলে শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, ফলে তার শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল ক্ষয় হয়৷ যদি তার ডায়রিয়া থাকে তাহলে আরও বেশি তরল ক্ষয় হয়৷ সুতরাং নিশ্চিত করবেন আপনার শিশু যেন এসময়ে তরল পান করে৷ শিশুকে ঠাণ্ডা তরল পান করাবেন, গরম নয়, আর তাকে এক বারে অনেক পান না করিয়ে, অল্প করে ঘন ঘন দেবেন৷

এ সময়ে শিশুর খাবারে কিছুটা বৈচিত্র্য আনতে পারেন, শিশুকে সুপ, জাউ ও হালুয়া খাওয়াবেন৷ যেসব শিশু বুকের দুধ খায়, তাদের নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াবেন, এতে শরীরে তরলের অভাব পূরণ হবে৷ যদি শিশু রজ্বরের সাথে ২৪ ঘণ্টার বেশি ডায়রিয়া থাকে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন এবং খাবার স্যালাইন খাওয়াবেন৷

শিশুকে হালকা পোশাক পরান

শিশুকে লেপ, কাথা, তোষক ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে রাখলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাবে, এর ফলে জ্বরের অবনতি ঘটবে৷ তাই আপনার শিশুকে হালকা পোশাক পরাবেন, এবং ঘুমানোর সময় একটা পাতলা কম্বল বা চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে দেবেন৷ শিশুকে পছন্দ মত খেতে দিন

জ্বর হলে শিশুরা খেতে চায়না৷ যদি শিশু জ্বরের সময় খেতে না চায়, তাকে খাবার জন্য বেশি জোরাজুরি করবেন না৷ যদি আপনার শিশু নির্দিষ্ট কোন খাবার খেতে চায়, তাকে সেই খাবার খেতে দেবেন৷

শিশুকে ঘরে রাখুন

শিশুর যত দিন জ্বর থাকে, তখন তাকে বাইরে বেড়াতে না দিয়ে ঘরে রাখা সবচেয়ে ভাল৷ শিশুর তাপমাত্রা স্বাভাবিক হবার ২৪ ঘণ্টা পর তাকে স্কুলে যেতে দিতে পারেন৷ তবে অনেক ক্ষেত্রে জ্বর চলে যাবার পরও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়৷

তথ্যসূত্রঃ তথ্য আপা প্রকল্প এবং ইন্টারনেট

আরো পড়ুন
মন্তব্য
Loading...
error: Content is protected !!
DMCA.com Protection Status